• মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬, ১৮ ফাল্গুন ১৪৩২
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন 

জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী কর্মসূচিতে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলুন

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন 

জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী কর্মসূচিতে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলুন

  আন্দোলন প্রতিবেদন  

বৃহঃস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

বুর্জোয়া নির্বাচনকে সামনে রেখে শাসকশ্রেণির দলগুলোর মধ্যে তীব্র কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে গেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করছে না। বুর্জোয়া বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে নামার পর থেকেই তাদেরকে বাধা প্রদানের হাজারটা কূটকৌশল ও অপচেষ্টা করেছে। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে একটি অবাধ নির্বাচনের দাবিতে বিভাগীয় শহরসহ বড় বড় শহরে সমাবেশ করেছে বিএনপি। কুমিল্লা বাদে আর সবগুলোতেই কৌশলে পরিবহণ ধর্মঘট করিয়ে সংগঠিত হতে বাধাগ্রস্ত করেছে। মিথ্যা-গায়েবি মামলা দিয়ে বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করছে। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ নিজ শ্রেণির প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা থেকে এক মুহূর্তও বিরত থাকছে না। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে ঘিরে হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগ যত সব ফ্যাসিস্ট নাটক ও মিথ্যাচার করেছে তার দৃষ্টান্ত এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর পাওয়া যাবে না। তারা যে ক্ষমতা হারানোর ভয় পেয়ে গেছে সেটা দৃশ্যমান। 

তাছাড়াও কূটকৌশলে ক্ষমতা বাগিয়ে নেয়ার জন্য অধিকাংশ বিরোধীদলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের তল্পিবাহক ইলেকশন কমিশন দ্বারা দেড়শ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বেহাল দশায় গণবিরোধী এ সরকার এগুলো কিনতে জনগণের সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় করবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক রদবদল করছে। 

জাতীয় এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি প্রভুদের হস্তক্ষেপ বরাবরের মতো চলছে। তুরস্ক এবং জাপানের কূটনীতিকদের বিস্ফোরক মন্তব্য হাসিনা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিদেশে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে লবিস্ট নিয়োগ করেও নিশ্চিত হতে না পেরে প্রধানমন্ত্রী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিদেশ সফর করছে। এসব সফরের উদ্দেশ্য হলো হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদীদের সমর্থন জোগানো। তবে প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকা সফর খুব একটা সফল হয়নি সেটা তার সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রতি বিষোদগার থেকেই বোঝা গেছে। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের চীনঘেঁষা নীতিতে আমেরিকা অসন্তুষ্ট। এজন্যই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নও বলছে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। ভারতই হাসিনা সরকারের প্রধান ভরসা। এজন্য শেখ হাসিনা তড়িঘড়ি ভারত সফর করেছে। কিন্তু ভারতও যে হাসিনা সরকারকে আগের মতো করে নিরঙ্কুশ ভাবে সমর্থন করছে না সেটা ভারতের বিবিধ প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যায়। এরও কারণ হলো সরকারের চীনা-কানেকশন। যখন পশ্চিমা বিশ্ব পদ্মা সেতু থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল তখন সরকার চীনা সহায়তায় তার এ বৈতরণী পার হয়েছে। এখন তিস্তা ব্যারাজের জন্যও চীন খুবই আগ্রহী। কিন্তু সরকার ভারতের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে এখনো তাতে সাড়া দিচ্ছে না। তবে ভারতের শতভাগ সন্তুষ্টি অর্জনও সরকার করতে পারছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতেও হাসিনা সরকারের দু’নৌকায় পা দেয়ার কূটনীতি আমেরিকাকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। তাই, তারা তো সরকারকে চাপে রেখেছেই। এমনকি ভারতও তাকে পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক চেক দিচ্ছে না।

সব মিলিয়ে হাসিনা-আওয়ামী সরকার একটা সংকটকাল অতিক্রম করছে। যার সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের বিদেশ-নির্ভর অর্থনীতি ও লুটপাটের ফলশ্রুতি হিসেবে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট– ডলার সংকট, রিজার্ভ কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট– ইত্যাদি। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে গুম, খুন ও ক্রসফায়ার চালাচ্ছে। লুটপাট-দুর্নীতির লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের বিভিন্ন অপকর্মকে বৈধতা দিয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জনগণের কণ্ঠরোধ করে তাদের বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে। হাসিনা এবং তার পরিবারের সমালোচনা করলেই ডিজিটাল আইনে মামলা করে কারাগারে নিক্ষেপ করছে। জনগণকে অগ্নি মূল্যে নিত্যদ্রব্য ক্রয় করিয়ে আওয়ামী সমর্থিত সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করার সুযোগ করে দিয়েছে।

বিএনপি ও বুর্জোয়া বিরোধীরা একেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। তাদের চলমান আন্দোলনে একদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের এক ধরনের সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী অত্যাচার ও দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা জনগণ, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের সমর্থন রয়েছে। বিএনপিও প্রচুর টাকা খরচ করে বিদেশি লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তারাও পুনরায় ক্ষমতায় যেতে হাসিনা থেকে বেশি কিছু দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রভুদের খুশি করতে চাইবে। দুই দলই গণবিরোধী। বুর্জোয়া বড় দুই দলই ক্ষমতা দখল করতে বিদেশি প্রভুদের পদলেহন করছে। তবে জনগণের জন্য আশু সমস্যা হলো হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ। এবং তারাই বর্তমানে জনগণের অধিকতর বিপদজনক শত্রু।

ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জনমত শক্তিশালী হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী প্রভুরা এমন সংকটময় মুহূর্তে চাপ সৃষ্টি করে বেশ কিছু আদায় করে নেয়ার পলিসি নিয়ে আগাচ্ছে। সম্প্রতি আইএমএফ-এর সাথে এক দেশবিরোধী ঋণ-চুক্তি এর প্রমাণ। গত ৩০ নভেম্বর’২২ ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সাথে ‘সৌজন্য’ সাক্ষাতে বলেছে বাংলাদেশ ভারতের ‘খুব ভাল বন্ধু’; ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য ভারতের একটি নীতি রয়েছে।......... যেকোনো বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায় বাংলাদেশ।’ প্রতিউত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছে– ‘আওয়ামী লীগ কখনো সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয় না এবং বাংলাদেশের মাটিকে কখনোই এ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে দেয় না।’ এই সব কৌশলী সংলাপ ও বচন-এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কী সব সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বা প্রণয় ভার্মা নির্বাচন প্রশ্নে কী পরামর্শ দিয়েছে তা পরিষ্কার না হলেও এই সব বার্তায় ভারতের স্বার্থ আদায় এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে বিএনপিকে ঠেঙানোর মদদ দেয়া অমূলক কিছু নয়। কারণ ভারতের মদদ-প্রশ্রয়েই হাসিনা-আওয়ামী লীগ বিগত ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে ফ্যাসিবাদী শাসন চালাচ্ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের স্বরাষ্ট সচিব সুজাতা সিং-এর কর্মকাণ্ড এদেশের জনগণ ভোলেনি।

ভারতের মদদ পেলেও মার্কিন সহ ইউরোপীয় ইউনিয়েনের চাপ, বিরোধী দলের আন্দোলনে হাসিনা-আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত। তাই তারা বিএনপি’র সমাবেশগুলোকে, বিশেষত ঢাকার সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে ১৫ দিনের ‘বিশেষ অভিযান’ চালিয়ে হাজার হাজর বিএনপি’র নেতা-কর্মী সহ বহু জনগণকে গ্রেপ্তার করছে। তারা বিএনপি’র নয়াপল্টনের সমাবেশ বন্ধ করতে খোলামেলা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে তারা রণক্ষেত্রে পরিণত করে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বিএনপি’র ১ জন কর্মী নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে (এ পর্যন্ত বিএনপি’র ৮ জন নেতা-কর্মীকে চলমান আন্দোলনে খুন করা হয়েছে)। এছাড়া পুলিশ বিএনপি’র অফিস ঘেরাও করে তিনশত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করে এবং অফিসে তালা ঝুলিয়ে নয়াপল্টন এলাকা ঘেরাও করে রাখে। ৮ ডিসেম্বর বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাসকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং নতজানু বিচার বিভাগ তাদের কারাগারে পাঠায়। ঢাকাগামী সমস্ত বাসে যাত্রীদের তল্লাশী চালায়, ঢাকার সবগুলো প্রবেশ পথে তল্লাশী চৌকি বসায়। ৯ ডিসেম্বর রাত থেকে ঢাকা ও দূরপাল্লার বাস বন্ধ, গোলাপবাগে দ্রুতগতির ইন্টারনেট বন্ধ, রাস্তায় জনগণের মোবাইল এসএমএস চেক– ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেরাই সারাদেশে হরতাল ও ভীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিএনপি’কে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করায় বাধ্য করতে না পারলেও ঢাকার গোলাপবাগে পাঠায়। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি প্রভুদের উদ্বেগ প্রকাশ এবং মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার রক্ষায় আহবান জানায় সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা জাতিসংঘ।

 শুধু তাই নয়। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সহযোগী সংগঠনের গুণ্ডাদের লেলিয়ে দিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের পাড়া-মহল্লায় পাহারা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার নামে জনগণের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছে– ‘যে হাত দিয়ে মারতে আসবে, সেই হাত ভেঙে দিতে হবে। যে হাত দিয়ে আগুন দিতে আসবে, সেই হাত আগুনে পোড়াতে হবে। পোড়ার যন্ত্রণাটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই হুকুম তাদের ‘আইনের শাসন’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম এবং নেতা-কর্মীদের ফ্যাসিবাদে সজ্জিত করার প্রকাশ্য ঘোষণা। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! হাসিনা-আওয়ামী সরকার জনগণের নিরাপত্তার নামে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার অপকৌশলে অঘোষিত হরতাল করে, সড়কগুলো দখল করে জনগণের অশেষ দুর্গতি ছাড়াও হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি করেছে।

১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ থেকে বিএনপি ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং বিএনপি সাংসদরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করে দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু হাসিনা সরকার সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না। যদিনা ভারতসহ বিদেশি প্রভুদের এবং দেশে সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ঘোষিত বা অঘোষিত বিদ্রোহের চাপে পড়ে। আন্দোলনে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করতে পারে বা ২০০৭ সালের মতো “তৃতীয় শক্তি” ক্ষমতা নিতে পারে।

বিরোধী দল বিএনপিও নানা সংস্কার কর্মসূচি দিচ্ছে। বলছে তারা রাষ্ট্রের মেরামত করবে। কিন্তু তারাও ব্যাপক জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার মৌলিক কোনো কর্মসূচি দিতে সক্ষম নয়। জনদুর্ভোগের জন্য ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে দায়ী করলেও বা লুটপাট করে টাকা পাচারকারী দুর্নীতিবাজদের তালিকা প্রকাশের কথা বললেও তাদের অতীত কর্মকাণ্ড একে সমর্থন করে না। কারণ তারাও ক্ষমতায় গিয়ে এই গণবিরোধী শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং তাকেই পরিচালনা করবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতে জনগণকে বুর্জোয়া দলগুলোর ক্ষমতা দখলের/ভাগাভাগির কামড়াকামড়ি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে উচ্ছেদ এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সর্বস্তরের জনগণকে বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এবং শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের ক্ষমতা ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করতে হবে।

–১২ ডিসেম্বর ’২২

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোন 

জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী কর্মসূচিতে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলুন

 আন্দোলন প্রতিবেদন 
বৃহঃস্পতিবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২২  |  অনলাইন সংস্করণ

বুর্জোয়া নির্বাচনকে সামনে রেখে শাসকশ্রেণির দলগুলোর মধ্যে তীব্র কামড়াকামড়ি শুরু হয়ে গেছে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার এমন কোনো অপকর্ম নেই যা করছে না। বুর্জোয়া বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে নামার পর থেকেই তাদেরকে বাধা প্রদানের হাজারটা কূটকৌশল ও অপচেষ্টা করেছে। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে অক্ষত রেখে একটি অবাধ নির্বাচনের দাবিতে বিভাগীয় শহরসহ বড় বড় শহরে সমাবেশ করেছে বিএনপি। কুমিল্লা বাদে আর সবগুলোতেই কৌশলে পরিবহণ ধর্মঘট করিয়ে সংগঠিত হতে বাধাগ্রস্ত করেছে। মিথ্যা-গায়েবি মামলা দিয়ে বহু নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করছে। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ নিজ শ্রেণির প্রতিপক্ষকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা থেকে এক মুহূর্তও বিরত থাকছে না। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশকে ঘিরে হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগ যত সব ফ্যাসিস্ট নাটক ও মিথ্যাচার করেছে তার দৃষ্টান্ত এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর পাওয়া যাবে না। তারা যে ক্ষমতা হারানোর ভয় পেয়ে গেছে সেটা দৃশ্যমান। 

তাছাড়াও কূটকৌশলে ক্ষমতা বাগিয়ে নেয়ার জন্য অধিকাংশ বিরোধীদলের বিরোধিতা সত্ত্বেও তাদের তল্পিবাহক ইলেকশন কমিশন দ্বারা দেড়শ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছে। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বেহাল দশায় গণবিরোধী এ সরকার এগুলো কিনতে জনগণের সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ব্যয় করবে। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রশাসনিক রদবদল করছে। 

জাতীয় এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি প্রভুদের হস্তক্ষেপ বরাবরের মতো চলছে। তুরস্ক এবং জাপানের কূটনীতিকদের বিস্ফোরক মন্তব্য হাসিনা সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিদেশে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে লবিস্ট নিয়োগ করেও নিশ্চিত হতে না পেরে প্রধানমন্ত্রী ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিদেশ সফর করছে। এসব সফরের উদ্দেশ্য হলো হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদীদের সমর্থন জোগানো। তবে প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকা সফর খুব একটা সফল হয়নি সেটা তার সফর পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রতি বিষোদগার থেকেই বোঝা গেছে। হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের চীনঘেঁষা নীতিতে আমেরিকা অসন্তুষ্ট। এজন্যই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নও বলছে তারা সুষ্ঠু নির্বাচন দেখতে চায়। ভারতই হাসিনা সরকারের প্রধান ভরসা। এজন্য শেখ হাসিনা তড়িঘড়ি ভারত সফর করেছে। কিন্তু ভারতও যে হাসিনা সরকারকে আগের মতো করে নিরঙ্কুশ ভাবে সমর্থন করছে না সেটা ভারতের বিবিধ প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যায়। এরও কারণ হলো সরকারের চীনা-কানেকশন। যখন পশ্চিমা বিশ্ব পদ্মা সেতু থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল তখন সরকার চীনা সহায়তায় তার এ বৈতরণী পার হয়েছে। এখন তিস্তা ব্যারাজের জন্যও চীন খুবই আগ্রহী। কিন্তু সরকার ভারতের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে এখনো তাতে সাড়া দিচ্ছে না। তবে ভারতের শতভাগ সন্তুষ্টি অর্জনও সরকার করতে পারছে না। ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতেও হাসিনা সরকারের দু’নৌকায় পা দেয়ার কূটনীতি আমেরিকাকে সন্তুষ্ট করতে পারছে না। তাই, তারা তো সরকারকে চাপে রেখেছেই। এমনকি ভারতও তাকে পুরোপুরি ব্ল্যাঙ্ক চেক দিচ্ছে না।

সব মিলিয়ে হাসিনা-আওয়ামী সরকার একটা সংকটকাল অতিক্রম করছে। যার সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের বিদেশ-নির্ভর অর্থনীতি ও লুটপাটের ফলশ্রুতি হিসেবে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট– ডলার সংকট, রিজার্ভ কমে যাওয়া, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি-বিদ্যুৎ সংকট– ইত্যাদি। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় বাহিনী দিয়ে গুম, খুন ও ক্রসফায়ার চালাচ্ছে। লুটপাট-দুর্নীতির লক্ষ-কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। বিভিন্ন আইনের মাধ্যমে মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের বিভিন্ন অপকর্মকে বৈধতা দিয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জনগণের কণ্ঠরোধ করে তাদের বাকস্বাধীনতা হরণ করেছে। হাসিনা এবং তার পরিবারের সমালোচনা করলেই ডিজিটাল আইনে মামলা করে কারাগারে নিক্ষেপ করছে। জনগণকে অগ্নি মূল্যে নিত্যদ্রব্য ক্রয় করিয়ে আওয়ামী সমর্থিত সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করার সুযোগ করে দিয়েছে।

বিএনপি ও বুর্জোয়া বিরোধীরা একেই সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চাইছে। তাদের চলমান আন্দোলনে একদিকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের এক ধরনের সমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী অত্যাচার ও দ্রব্যমূল্যের চাপে দিশেহারা জনগণ, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের সমর্থন রয়েছে। বিএনপিও প্রচুর টাকা খরচ করে বিদেশি লবিস্ট নিয়োগ করেছে। তারাও পুনরায় ক্ষমতায় যেতে হাসিনা থেকে বেশি কিছু দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রভুদের খুশি করতে চাইবে। দুই দলই গণবিরোধী। বুর্জোয়া বড় দুই দলই ক্ষমতা দখল করতে বিদেশি প্রভুদের পদলেহন করছে। তবে জনগণের জন্য আশু সমস্যা হলো হাসিনা-আওয়ামী ফ্যাসিবাদ। এবং তারাই বর্তমানে জনগণের অধিকতর বিপদজনক শত্রু।

ফ্যাসিষ্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে জনমত শক্তিশালী হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী, সম্প্রসারণবাদী প্রভুরা এমন সংকটময় মুহূর্তে চাপ সৃষ্টি করে বেশ কিছু আদায় করে নেয়ার পলিসি নিয়ে আগাচ্ছে। সম্প্রতি আইএমএফ-এর সাথে এক দেশবিরোধী ঋণ-চুক্তি এর প্রমাণ। গত ৩০ নভেম্বর’২২ ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সাথে ‘সৌজন্য’ সাক্ষাতে বলেছে বাংলাদেশ ভারতের ‘খুব ভাল বন্ধু’; ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য ভারতের একটি নীতি রয়েছে।......... যেকোনো বিষয়ে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায় বাংলাদেশ।’ প্রতিউত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেছে– ‘আওয়ামী লীগ কখনো সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয় না এবং বাংলাদেশের মাটিকে কখনোই এ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে দেয় না।’ এই সব কৌশলী সংলাপ ও বচন-এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কী সব সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বা প্রণয় ভার্মা নির্বাচন প্রশ্নে কী পরামর্শ দিয়েছে তা পরিষ্কার না হলেও এই সব বার্তায় ভারতের স্বার্থ আদায় এবং আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে বিএনপিকে ঠেঙানোর মদদ দেয়া অমূলক কিছু নয়। কারণ ভারতের মদদ-প্রশ্রয়েই হাসিনা-আওয়ামী লীগ বিগত ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থেকে ফ্যাসিবাদী শাসন চালাচ্ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ভারতের স্বরাষ্ট সচিব সুজাতা সিং-এর কর্মকাণ্ড এদেশের জনগণ ভোলেনি।

ভারতের মদদ পেলেও মার্কিন সহ ইউরোপীয় ইউনিয়েনের চাপ, বিরোধী দলের আন্দোলনে হাসিনা-আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত। তাই তারা বিএনপি’র সমাবেশগুলোকে, বিশেষত ঢাকার সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ নিয়েছে। বিভিন্ন অজুহাতে ১৫ দিনের ‘বিশেষ অভিযান’ চালিয়ে হাজার হাজর বিএনপি’র নেতা-কর্মী সহ বহু জনগণকে গ্রেপ্তার করছে। তারা বিএনপি’র নয়াপল্টনের সমাবেশ বন্ধ করতে খোলামেলা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে তারা রণক্ষেত্রে পরিণত করে। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বিএনপি’র ১ জন কর্মী নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছে (এ পর্যন্ত বিএনপি’র ৮ জন নেতা-কর্মীকে চলমান আন্দোলনে খুন করা হয়েছে)। এছাড়া পুলিশ বিএনপি’র অফিস ঘেরাও করে তিনশত নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করে এবং অফিসে তালা ঝুলিয়ে নয়াপল্টন এলাকা ঘেরাও করে রাখে। ৮ ডিসেম্বর বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাসকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং নতজানু বিচার বিভাগ তাদের কারাগারে পাঠায়। ঢাকাগামী সমস্ত বাসে যাত্রীদের তল্লাশী চালায়, ঢাকার সবগুলো প্রবেশ পথে তল্লাশী চৌকি বসায়। ৯ ডিসেম্বর রাত থেকে ঢাকা ও দূরপাল্লার বাস বন্ধ, গোলাপবাগে দ্রুতগতির ইন্টারনেট বন্ধ, রাস্তায় জনগণের মোবাইল এসএমএস চেক– ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেরাই সারাদেশে হরতাল ও ভীতির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। বিএনপি’কে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করায় বাধ্য করতে না পারলেও ঢাকার গোলাপবাগে পাঠায়। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশি প্রভুদের উদ্বেগ প্রকাশ এবং মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার রক্ষায় আহবান জানায় সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা জাতিসংঘ।

 শুধু তাই নয়। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সহযোগী সংগঠনের গুণ্ডাদের লেলিয়ে দিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাদের পাড়া-মহল্লায় পাহারা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার নামে জনগণের মাঝে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছে– ‘যে হাত দিয়ে মারতে আসবে, সেই হাত ভেঙে দিতে হবে। যে হাত দিয়ে আগুন দিতে আসবে, সেই হাত আগুনে পোড়াতে হবে। পোড়ার যন্ত্রণাটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই হুকুম তাদের ‘আইনের শাসন’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম এবং নেতা-কর্মীদের ফ্যাসিবাদে সজ্জিত করার প্রকাশ্য ঘোষণা। কী ভয়ঙ্কর অবস্থা! হাসিনা-আওয়ামী সরকার জনগণের নিরাপত্তার নামে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার অপকৌশলে অঘোষিত হরতাল করে, সড়কগুলো দখল করে জনগণের অশেষ দুর্গতি ছাড়াও হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি করেছে।

১০ ডিসেম্বরের সমাবেশ থেকে বিএনপি ১০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে এবং বিএনপি সাংসদরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করে দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু হাসিনা সরকার সহজে ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না। যদিনা ভারতসহ বিদেশি প্রভুদের এবং দেশে সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ঘোষিত বা অঘোষিত বিদ্রোহের চাপে পড়ে। আন্দোলনে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে জরুরি অবস্থাও ঘোষণা করতে পারে বা ২০০৭ সালের মতো “তৃতীয় শক্তি” ক্ষমতা নিতে পারে।

বিরোধী দল বিএনপিও নানা সংস্কার কর্মসূচি দিচ্ছে। বলছে তারা রাষ্ট্রের মেরামত করবে। কিন্তু তারাও ব্যাপক জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার মৌলিক কোনো কর্মসূচি দিতে সক্ষম নয়। জনদুর্ভোগের জন্য ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে দায়ী করলেও বা লুটপাট করে টাকা পাচারকারী দুর্নীতিবাজদের তালিকা প্রকাশের কথা বললেও তাদের অতীত কর্মকাণ্ড একে সমর্থন করে না। কারণ তারাও ক্ষমতায় গিয়ে এই গণবিরোধী শাসকশ্রেণি ও রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং তাকেই পরিচালনা করবে।

বিদ্যমান পরিস্থিতে জনগণকে বুর্জোয়া দলগুলোর ক্ষমতা দখলের/ভাগাভাগির কামড়াকামড়ি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে উচ্ছেদ এবং জাতীয় সংকট মোকাবিলায় সর্বস্তরের জনগণকে বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই-সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এবং শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণের ক্ষমতা ও সরকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বেগবান করতে হবে।

–১২ ডিসেম্বর ’২২

আরও খবর
 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র